দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীন এবার দেশের উচ্চপ্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়া ঠেকাতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির নতুন প্রবেশ ও বহির্গমন বিধি অনুযায়ী, ব্যাটারি, বিরল খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে দক্ষ প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের বিদেশযাত্রা ঠেকানোর ক্ষমতা পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দক্ষতাকে ‘শিল্প ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার’ জন্য হুমকি মনে করা হলে তাদের দেশত্যাগে বাধা দেওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। রোবোটিকস, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, নিখুঁত প্রকৌশল ও অটোমোটিভ যন্ত্রাংশের মতো খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি প্রকৌশলী নিয়োগ, শিল্প গুপ্তচরবৃত্তি এবং সাইবার হামলার মাধ্যমে প্রযুক্তি অর্জনের সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এখন পরিস্থিতি অনেকটাই উল্টো দিকে মোড় নিচ্ছে। চীন নিজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও মেধা বিদেশে চলে যাওয়া ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি বিদেশে বিনিয়োগের নিয়ম কঠোর করার পাশাপাশি চীনা নাগরিকদের অফশোর সম্পদ রাখার ওপরও নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির আইন অধ্যাপক হেনরি গাও মনে করেন, এসব পদক্ষেপ চীনের অর্থনীতির প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার ভাষায়, এসব ব্যবস্থা থেকে বোঝা যায়, বেইজিং অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও বড় ধরনের মূলধন পাচার নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা ও দক্ষ জনশক্তির দেশত্যাগ ঠেকাতেও সরকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।
চীনের অর্থনীতিতে চাপের বিষয়টি সাম্প্রতিক বিভিন্ন সূচকেও ফুটে উঠছে। উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের জন্য বিদেশি চাহিদা শক্তিশালী থাকলেও দেশটির আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় দুর্বল করেছে। গ্রীষ্মকালে ব্যাংক ঋণ বিতরণ রেকর্ড নিম্নে নেমে যায়। আগস্টে নতুন গাড়ি বিক্রিও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে যায়।
এদিকে সম্প্রতি চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রেন ঝেংফেই এবং তার মেয়ে ও কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মেং ওয়ানঝৌ দেশ ছেড়েছেন—এমন গুঞ্জন ছড়ায়। তাইওয়ান ও ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমেও এসব দাবি প্রকাশিত হয়। তবে বুধবার চীনা ভাষার গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে রেন ঝেংফেইকে শেনঝেনে দেখা যায়। ছবিতে তাকে একটি চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তিতে সই করতে দেখা গেছে।
চীনা ধনীদের বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ওপরও নজরদারি বাড়ছে। ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চীন থেকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ বিদেশে চলে গেছে। ২০০৬ সালে হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল দেশটি থেকে ‘হট মানি’ বা দ্রুত স্থানান্তরযোগ্য মূলধনের সর্বোচ্চ বহির্গমন বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
তবে চীন নাগরিকদের বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ক্ষেত্রে বার্ষিক ৫০ হাজার ডলারের সরকারি সীমা পরিবর্তন করেনি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক ন্যাটিক্সিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরোর মতে, পরিবর্তন এসেছে মূলত ওই সীমা এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তরের অনানুষ্ঠানিক পথগুলোতে।
তার ভাষায়, ৫০ হাজার ডলারের সীমা অপরিবর্তিত থাকলেও অর্থ সাধারণত যেসব ব্যক্তি ও এজেন্টের মাধ্যমে বিদেশে যেত, এখন তাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
চীনে ও দেশের বাইরে এমন একটি শিল্পও গড়ে উঠেছে, যা মানুষ ও তাদের সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরে সহায়তা করে। অভিবাসন এজেন্টরা ভিসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে, আর অফশোর ব্রোকার ও ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো চীনা নাগরিকদের বিদেশে সম্পদ সংরক্ষণে সহায়তা করে।
এ ছাড়া কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি সহযোগী কোম্পানি, বিদেশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি কিংবা কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে একই সঙ্গে অর্থ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দেশের বাইরে স্থানান্তরের সুযোগ পায়। চীনের নতুন বিধিনিষেধ মূলত এই ধরনের বহির্গমন ঠেকাতেই আরও কঠোর হচ্ছে।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে